নবম জাতীয় বেতন কাঠামো–২০২৬ কার্যকরের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতা নির্ধারণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। নতুন বেতন কাঠামো চালু হলেও আপাতত সব ভাতার হিসাব নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে করা হবে না। বরং নতুন বেতন আদেশের আওতাবহির্ভূত মূল বেতনের শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতাগুলো ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ ও পরিশোধ করতে হবে।
গত ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সরকারি গেজেটেও নির্দেশনাটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ভাতাগুলোর ক্ষেত্রে এ নিয়ম কার্যকর থাকবে। <উদ্ধৃতি>অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও সরকারি গেজেটের তথ্যসূত্র: https://www.dpp.gov.bd/bgpress/bangla/index.php/document/get_extraordinary/63276
নতুন নির্দেশনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মচারীদের জন্য, যাঁরা পে-ফিক্সেশন, নতুন মূল বেতন, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার হিসাব নিয়ে জানতে চাইছেন।
কেন ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতন গুরুত্বপূর্ণ?
নবম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার ফলে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন নতুন নিয়মে নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু মূল বেতন পরিবর্তিত হলেই প্রচলিত সব ভাতার অঙ্ক একই সঙ্গে পরিবর্তিত হবে—বিষয়টি এমন নয়।
অর্থ বিভাগের নতুন নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো, নতুন বেতন আদেশের আওতার বাইরে থাকা মূল বেতনের শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতার হিসাব কোন মূল বেতনের ভিত্তিতে হবে, তা স্পষ্ট করা।
এ ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারী যে মূল বেতন আহরণ করেছেন, সেটিকেই সংশ্লিষ্ট ভাতা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পরবর্তী সরকারি আদেশ না আসা পর্যন্ত এ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
এর অর্থ, পে-ফিক্সেশনের মাধ্যমে কোনো কর্মচারীর মূল বেতন বৃদ্ধি পেলেও প্রজ্ঞাপনের আওতাভুক্ত ভাতার হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় হবে না।
শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা নিয়ে কী জানা প্রয়োজন?
সরকারি কর্মচারীদের শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে প্রাপ্য ছুটি ও ভাতার জন্য আবেদন করতে হয়। সংশ্লিষ্ট বিধি ও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদন এবং বিল দাখিলের মাধ্যমে এ সুবিধা দেওয়া হয়।
সরবরাহ করা নির্দেশিকায় শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতার পরিমাণ এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ হিসেবে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতার নিজস্ব প্রাপ্যতার বিধান এবং ১৯ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতার হিসাব—দুটিকে এক করে দেখা যাবে না।
কোনো কর্মচারীর শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতার হিসাব ৩০ জুনের মূল বেতনের ভিত্তিতে করতে হবে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের আওতা, প্রযোজ্য বিধি এবং এ ভাতার জন্য জারি করা পৃথক নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
অতএব, শুধু নতুন প্রজ্ঞাপনের শিরোনাম দেখে শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতার প্রতিটি ক্ষেত্রে একই হিসাব বাধ্যতামূলক বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
উদাহরণ দিয়ে ভাতার হিসাব বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারীর ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মূল বেতন ছিল ২৫ হাজার টাকা। নতুন পে-ফিক্সেশনের পর তাঁর মূল বেতন বেড়ে ৩০ হাজার টাকা হলো।
এখন যদি তাঁর কোনো প্রচলিত ভাতা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে নির্ধারিত হয় এবং সেটি ১৯ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনের আওতাভুক্ত হয়, তাহলে হিসাবটি হবে—
৩০ জুনের মূল বেতনের ভিত্তিতে:
২৫,০০০ × ১০% = ২,৫০০ টাকা।
অন্যদিকে, নতুন মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা ধরে হিসাব করলে অঙ্কটি দাঁড়াত ৩ হাজার টাকা। কিন্তু প্রজ্ঞাপনের আওতাভুক্ত ভাতার ক্ষেত্রে পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত ৩০ জুনের মূল বেতনকে ভিত্তি ধরতে হবে।
এটি কেবল হিসাব বোঝানোর উদাহরণ। বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট ভাতার হার, প্রাপ্যতা এবং প্রজ্ঞাপনের আওতাভুক্তি সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্গাপূজার উৎসব ভাতা নিয়ে কী বলা যায়?
২০২৬ সালের অক্টোবরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে উৎসব ভাতা ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের পরও আগের তারিখের মূল বেতন ধরে ভাতা প্রদানের বিষয়টি সরকারি কর্মচারীদের আলোচনায় এসেছে।
তবে উৎসব ভাতার হিসাবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উৎসব ভাতা-সংক্রান্ত আদেশ ও বেতন বিবরণী পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ১৯ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে যে ভাতাগুলো স্পষ্টভাবে আওতাভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে উৎসব ভাতার বিধান এক কি না, তা যাচাই ছাড়া সব ধরনের উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না।
এ কারণে সরকারি কর্মচারীদের নিজ নিজ বেতন স্লিপ, উৎসব ভাতা প্রদানের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ মিলিয়ে দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পে-ফিক্সেশনের পর কি ভাতার বকেয়া পাওয়া যাবে?
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং পুরোনো সময়ের ভাতার বকেয়া পাওয়ার বিষয় দুটি আলাদা।
পে-ফিক্সেশনের ফলে মূল বেতনের পার্থক্য তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট বেতন আদেশ অনুযায়ী বকেয়া হিসাব হতে পারে। কিন্তু কোনো ভাতা ৩০ জুনের মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করার নির্দেশনা থাকলে, শুধু নতুন মূল বেতন বেশি হওয়ার কারণে সেই ভাতার অতিরিক্ত বকেয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হবে না।
বকেয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে দেখতে হবে—
১. সংশ্লিষ্ট ভাতার জন্য কোন সময়ের মূল বেতন প্রযোজ্য।
২. ভাতার হার পরিবর্তনের কোনো পৃথক আদেশ জারি হয়েছে কি না।
৩. সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ওই ভাতার জন্য যোগ্য কি না।
৪. বকেয়া প্রদানের বিষয়ে সরকারি আদেশে স্পষ্ট অনুমোদন রয়েছে কি না।
এ কারণে পে-ফিক্সেশনের পর কোনো কর্মচারী অতিরিক্ত ভাতা বা বকেয়া পাবেন কি না, তা নির্দিষ্ট বিধি ও আদেশের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা এ নির্দেশনার আওতায়?
প্রজ্ঞাপনের বিবরণ অনুযায়ী, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্মচারী চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর আওতাবহির্ভূত মূল বেতনের শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতা পেয়ে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রাসঙ্গিক।
তবে কোনো কর্মচারী কোন ভাতা পাবেন এবং তাঁর ক্ষেত্রে কোন নিয়ম প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি, ভাতার ধরন এবং সরকারি আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
সরকারি কর্মচারীদের করণীয়
ভাতা নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে কর্মচারীদের কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা উচিত।
প্রথমত, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনের প্রমাণ হিসেবে বেতন স্লিপ বা সংশ্লিষ্ট বেতন বিবরণী সংরক্ষণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পে-ফিক্সেশনের পর নির্ধারিত নতুন মূল বেতনের সঙ্গে পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্য বুঝে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা এবং উৎসব ভাতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পৃথক আদেশ ও প্রাপ্যতার শর্ত যাচাই করতে হবে।
চতুর্থত, কোনো ভাতার হিসাব নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়া ভালো।
শেষ কথা
নবম জাতীয় বেতন কাঠামো–২০২৬ কার্যকরের পর সরকারি কর্মচারীদের প্রচলিত ভাতার হিসাব নিয়ে অর্থ বিভাগের ১৯ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। নতুন বেতন আদেশের আওতাবহির্ভূত মূল বেতনের শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতাগুলোর ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত মূল বেতনকে ভিত্তি করার কথা বলা হয়েছে।
তবে শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান এক কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদেশের ভাষা ও আওতা দেখে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সরকারি কর্মচারীদের জন্য তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন পে-ফিক্সেশনের অঙ্ক দেখেই সব ভাতা পুনর্নির্ধারিত হয়েছে বা সব ক্ষেত্রে বকেয়া পাওনা তৈরি হয়েছে বলে ধরে না নিয়ে, সরকারি প্রজ্ঞাপন ও নিজস্ব বেতন বিবরণী মিলিয়ে দেখা।
তথ্যসূত্র: অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপন; সরকারি গেজেট।
