নবম জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণ বা পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়সীমা ২০ অক্টোবর শেষ হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন মূল বেতন, আগের বেতনের সঙ্গে পার্থক্য এবং প্রাপ্য বকেয়া অর্থের হিসাব নির্ধারণের কাজ এগিয়েছে। এখন অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বকেয়া অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
২১ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইবাস প্লাস প্লাস (iBAS++) ব্যবস্থায় বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা ছিল। তবে প্রতিরক্ষা ও জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলেও সব কর্মচারীর ব্যক্তিগত পে-ফিকেশন, তথ্য যাচাই ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া একই পর্যায়ে রয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া পাওয়ার কথা
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে বেতন পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি কার্যকর ধরা হয়েছে। এ কারণে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের বেতন-ভাতার হিসাব সমন্বয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে এ সময়ের বকেয়া অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের।
তবে তিন মাসের বকেয়া মানেই প্রত্যেক কর্মচারী তিন মাসের সম্পূর্ণ নতুন মূল বেতনের সমপরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পাবেন, বিষয়টি এমন নয়। নতুন বেতন আদেশের ধাপভিত্তিক বাস্তবায়ন, পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর গ্রেড অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ হিসাব করতে হবে।
অর্থাৎ, একজন কর্মচারীর বকেয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর আগের মূল বেতন, নতুন স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতন, প্রযোজ্য বাস্তবায়ন-হার এবং অন্যান্য অনুমোদিত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একই গ্রেডের দুই কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস বা বেতন নির্ধারণের তথ্য ভিন্ন হলে তাঁদের প্রাপ্য অর্থেও পার্থক্য হতে পারে।
পে-ফিকেশন শেষ হওয়া আর টাকা পাওয়া এক বিষয় নয়
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে পে-ফিকেশন, বেতন বিল প্রস্তুত, বিল যাচাই এবং ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা—এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলেও পৃথক ধাপ।
প্রথমে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী ব্যক্তিগত মূল বেতন নির্ধারণ করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নিয়মিত বেতন ও বকেয়া অর্থের হিসাব প্রস্তুত করা যায়। কোনো কর্মচারীর তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে, আগের বেতন নির্ধারণে গরমিল থাকলে অথবা প্রয়োজনীয় বিল সাবমিট না হলে তাঁর ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে।
তাই ২০ অক্টোবর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়াকে সবার ব্যাংক হিসাবে বকেয়া অর্থ জমা হওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। অর্থ জমার প্রকৃত অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট অফিসের হিসাব শাখা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের তথ্য অনুসরণ করতে হবে।
iBAS++-এ বেতন নির্ধারণের আগে যেসব তথ্য জরুরি
আইবাস প্লাস প্লাসের পাইলটিং কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫ অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুন মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতার বিল সাবমিট করা ছাড়া জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুযায়ী নতুন বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না।
এ নির্দেশনার ভিত্তিতে পে-ফিকেশন সম্পন্ন করার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
- জুন ২০২৬ মাসের পুরোনো বেতন-ভাতা উত্তোলনের তথ্য সঠিক থাকা।
- জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতার বিল যথাযথভাবে সাবমিট করা।
- জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও চাকরিতে যোগদানের তারিখের তথ্য মিলিয়ে দেখা।
- পূর্ববর্তী পদোন্নতি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডের আদেশ সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
- নতুন বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে কোনো ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য আছে কি না, তা যাচাই করা।
কোনো কর্মচারীর পে-ফিকেশন আটকে থাকলে প্রথমেই এসব তথ্য যাচাই করা উচিত। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অফিসের ডিডিও, হিসাব শাখা অথবা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সহায়তা নিতে হবে।
নতুন বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
নবম জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ধিত মূল বেতনের সুবিধা ধাপে ধাপে কার্যকর করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন এবং তৃতীয় ধাপ ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং দশম থেকে বিংশ গ্রেডের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে এ হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হওয়ার কথা। তৃতীয় ধাপে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টসহ নতুন মূল বেতনের শতভাগ কার্যকরের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এখানে মনে রাখতে হবে, পে-ফিকেশনে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হলেও ধাপে ধাপে কতটুকু আর্থিক সুবিধা কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট বেতন আদেশের বিধান অনুযায়ী হিসাব করতে হবে। ফলে নতুন স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতন এবং নির্দিষ্ট সময়ে হাতে পাওয়া অর্থের পরিমাণ এক নাও হতে পারে।
ভাতা নির্ধারণেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
১৯ অক্টোবর অর্থ বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মূল বেতনের শতাংশভিত্তিতে দেওয়া প্রচলিত ভাতাগুলো ২০২৬ সালের ৩০ জুনে প্রাপ্ত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ ও প্রদান করতে হবে।
এ নির্দেশনা বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি ভাতা হিসাবের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হলেই সব ধরনের ভাতা একই হারে বা একই সময়ে পরিবর্তিত হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। কোন ভাতা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা সংশ্লিষ্ট আদেশ ও কার্যকর নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
তাই বেতন ও বকেয়া হিসাব করার সময় শুধু নতুন মূল বেতনের পার্থক্য বিবেচনা না করে ভাতাসংক্রান্ত নির্দেশনাও যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিরক্ষা ও জুডিশিয়াল সার্ভিসের ক্ষেত্রে কী অবস্থা?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিরক্ষা ও জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, যেসব দপ্তরে পে-ফিকেশনের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, সেখানেও ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণী বিবরণী যাচাই এবং বেতন বিল প্রস্তুতের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ একটি দপ্তরের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার তথ্য থেকে সব দপ্তরের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
সরকারি চাকরিজীবীদের এখন করণীয়
পে-ফিকেশনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের উচিত নিজেদের বেতন নির্ধারণের অবস্থা যাচাই করা। নতুন মূল বেতন নির্ধারণী বিবরণীতে তথ্য সঠিক আছে কি না, পুরোনো বেতনের সঙ্গে নতুন বেতনের পার্থক্য ঠিকভাবে হিসাব হয়েছে কি না এবং বকেয়া পাওনার হিসাব প্রস্তুত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
যাঁদের পে-ফিকেশন সম্পন্ন হয়নি, তাঁদের সংশ্লিষ্ট অফিসের মাধ্যমে সমস্যার কারণ জানতে হবে। আবার যাঁদের পে-ফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে, তাঁদেরও বেতন বিল ও অর্থ পরিশোধের অগ্রগতি সম্পর্কে দাপ্তরিক তথ্য অনুসরণ করা উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট তারিখে সবার বকেয়া জমা হবে কিংবা সবাই একই পরিমাণ অর্থ পাবেন—এমন দাবি দেখলে তা সরকারি নির্দেশনা দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী পে-ফিকেশনের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণ ও বকেয়া হিসাবের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের বকেয়া অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে বাস্তবে কার কত টাকা প্রাপ্য হবে এবং কখন ব্যাংক হিসাবে জমা হবে, তা নির্ভর করবে ব্যক্তিগত বেতন নির্ধারণ, যাচাই, বিল প্রস্তুত ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার ওপর।
সুতরাং, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজ নিজ পে-ফিকেশনের অবস্থা যাচাই করা এবং অর্থ বিভাগের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুসরণ করা। এতে নতুন বেতন ও বকেয়া অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হবে।
